ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় নিজেকে ‘আল্লাহর অলি’ ও পীর হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিল্লাত রাব্বিকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রতারণা, নারী ভক্তদের ব্রেইনওয়াশ, অবৈধ অর্থ আদায়, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম শোষণ এবং এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর ঘটনা—এমনটাই উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলায় নিজেকে ‘আল্লাহর অলি’ ও পীর হিসেবে পরিচয় দেওয়া মিল্লাত রাব্বিকে ঘিরে উঠেছে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ। ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে গড়ে ওঠা এই সাম্রাজ্যের ভেতরে লুকিয়ে আছে প্রতারণা, নারী ভক্তদের ব্রেইনওয়াশ, অবৈধ অর্থ আদায়, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম শোষণ এবং এক যুবকের রহস্যজনক মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর ঘটনা—এমনটাই উঠে এসেছে অনুসন্ধানে।
২০২৫ সালের ১ জুন দেশের একাধিক গণমাধ্যমে মিল্লাত রাব্বির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি প্রথমবারের মতো প্রকাশ্য আলোচনায় আসে। প্রকাশিত সংবাদে পীরত্বের আড়ালে ভণ্ডামি ও অপকর্মের অভিযোগ তুলে ধরা হলে শুরু হয় ভিন্ন এক নাটক। অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে সংবাদ ম্যানেজ করতে এক সিনিয়র সাংবাদিককে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়। সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলে মিল্লাত রাব্বির বাড়িতে আয়োজন করা হয় তথাকথিত সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন। এলাকাবাসীর একাংশ একে ব্যঙ্গ করে ‘বিরিয়ানি সম্মেলন’ বলেও আখ্যা দেয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ওই কর্মসূচিতে মিল্লাত রাব্বির ঢাল হয়ে দাঁড়ান কিছু সুবিধাবাদী নেতা ও সাংবাদিক। পরদিন নান্দাইলের কয়েকটি অনলাইন পোর্টাল ও একটি ফেসবুক পেজে মূল অভিযোগকে আড়াল করে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা হয়। এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—এটি কেবল ধর্মীয় ইস্যু নয়, বরং একটি সংঘবদ্ধ স্বার্থরক্ষার চিত্র।নিউজ টেন টিভির অপরাধ অনুসন্ধান টিমের অনুসন্ধানে উঠে আসে, মিল্লাত রাব্বির ভক্তদের বড় একটি অংশ তরুণী নারী, যাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ভুক্তভোগী জানান, পীরের আশীর্বাদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের পরিবার, স্বামী-সংসার এবং স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। কেউ কেউ নিজেদের সব অর্থ ও সম্পদ পীরের হাতে তুলে দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন তার আস্তানায় বা শহরের ভাড়া করা ফ্ল্যাটে।অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মিল্লাত রাব্বির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের জীবনযাপন ইসলামী শরিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর। অথচ ভক্তদের কাছে ধর্মীয় কড়াকড়ির বাণী শোনানো হয়। পীর নিজে জনসম্মুখে খুব কম আসলেও তার আশপাশের একটি বিশ্বস্ত নেটওয়ার্ক নিয়মিত ভক্ত সংগ্রহ ও অর্থ আদায়ের কাজ করে।
এই সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায়টি সামনে আসে রনি (২২) নামের এক যুবকের মৃত্যুকে ঘিরে। রনির বাড়ি নান্দাইল উপজেলার রাজগাতী খালপার বড়বাড়ি এলাকায়। পরিবার ও স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে মিল্লাত রাব্বির আস্তানায় একটি ‘দুর্ঘটনায়’ গুরুতর আহত হন রনি। পরদিন হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন—মৃত্যুর পর কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই কেন দ্রুত লাশ দাফন করা হলো?বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, আকস্মিক বা সন্দেহজনক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রনির ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। এলাকাবাসীর অভিযোগ, প্রশাসনের কিছু অসাধু সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সহযোগিতায় বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়। ফলে দুর্ঘটনা নাকি পরিকল্পিত হত্যা—এই প্রশ্ন আজও অমীমাংসিত।
নিউজ টেনের অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, পীরের আস্তানায় নারী ও পুরুষ ভক্তদের জন্য আলাদা ব্রেইনওয়াশ টিম রয়েছে। ধর্মীয় মাহফিল ও দোয়ার নামে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। ভক্তদের দিয়ে কৃষিকাজ, গরু ও মুরগির খামারে বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম করানো হয়—যা কার্যত আধুনিক দাসত্বের শামিল বলে মনে করছেন সচেতন মহল।সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়টি। অনুসন্ধানী টিমের হাতে আসা কিছু ভিডিও ও তথ্য অনুযায়ী, পীরের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চরম নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি তার পরিচালিত মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে শিশুদের বলাৎকারের অভিযোগও উঠে এসেছে, যা এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
নিউজ টেন টিভি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই অনুসন্ধান কোনো হাক্কানি পীর, ইসলাম বা ধর্মীয় অনুভূতির বিরুদ্ধে নয়। বরং ধর্মের নামে সংঘটিত প্রতারণা, শোষণ ও অপরাধের অভিযোগ যাচাই করাই তাদের লক্ষ্য। সংবাদ প্রকাশের পর একাধিক ভুক্তভোগী পরিবার গণমাধ্যমটির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বলেও জানানো হয়।
এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, একসময় একটি বারান্দার ঘরে বসবাস করা ব্যক্তি কীভাবে অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হলো—তা খতিয়ে দেখা জরুরি। তাদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত তদন্ত ছাড়া এই রহস্যের জট খুলবে না।এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা—ধর্মের আড়ালে গড়ে ওঠা এই ভণ্ডামির সাম্রাজ্য তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হবে এবং প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসবে।